সমাজকল্যান প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট প্রমোদ মানকিন এমপি আর নেই

সমাজকল্যান প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট প্রমোদ মানকিন এমপি আর নেই

স্টাফ রিপোর্টার: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যান প্রতিমন্ত্রী ময়মনসিংহ ১ হালুয়াঘাট ধোবাউড়া আসনের সংসদ সদস্য এডভোকেট প্রমোদ মানকিন স্যার আর নেই।  তিনি বুধবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় ভারতের মুম্বাইয়ের হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দুরারোগ্য ফুসফুস ও লিভারের সমস্যায় ভূগছিলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। তাঁর মৃত্যুতে হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া উপজেলায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

ধোবাউড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আওয়ামীলীগ নেতা হাজী মজনু মৃধা প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট প্রমোদ মানকিন এমপি এর মৃত্যুতে গভীর শোক এবং শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন । তিনি বলেন, সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফুরকান উদ্দিন সেলিম মৃধাকে হারানোর শোক এখনো জনগণের মনে লেগে আছে। আর এখন আমরা আমাদের প্রতিমন্ত্রীকে হারিয়ে আরো একজন অভিভাবক হারালাম।

উল্লেখ্য, এডভোকেট প্রমোদ মানকিন এমপি ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল নেত্রকোণা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার বাকালজোড়া ইউনিয়নের রামনগর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত গারো পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা স্বর্গীয় মেঘা তজু এবং মা স্বর্গীয়া হৃদয় শিসিলিয়া মানকিন। তিনি আট ভাই-বোনের মধ্যে পঞ্চম।

প্রমোদ মানকিন ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে নটরডেম কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব আর্টস (বিএ) ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে ব্যাচেলর অব এডুকেশন (বি.এড) এবং ময়মনসিংহ ‘ল’ কলেজ থেকে ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে এলএলবি ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি ময়মনসিংহ জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য।
ছাত্রজীবন ও কর্মজীবনের শুরু থেকেই তিনি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগদানের মাধ্যমে তার সরাসরি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ। বর্তমানে তিনি হালুয়াঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য।
গারো এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একজন প্রতিনিধি হিসেবে  মানকিন জাতীয়ভিত্তিক সামাজিক সংস্থা- ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন এর প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ছিলেন। তিনি এখনও প্রতিষ্ঠানটির কেন্দ্রীয় সভাপতি দায়িত্ব পালন করেছেন।
একজন স্কুল শিক্ষক হিসেবে জনাব মানকিন কর্মজীবন শুরু করেন, পরে তিনি আইন পেশা ও এনজিও কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট হন। তিনি ১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত কারিতাস- বাংলাদেশ এর ময়মনসিংহ অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি বাংলাদেশে মানবাধিকার সমন্বয় কাউন্সিল (Coordinating Council on Human Rights in Bangladesh-CCHRB) ও বাংলাদেশ সমবায় ক্রেডিট ইউনিয়ন লীগ (CCULB) এর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক (সরকারি) এর সাবেক পরিচালক। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী সোসাইটির অন্যতম ভাইস প্রেসিডেন্ট, পাশাপশি সর্বদলীয় পার্লামেন্টারি গ্রুপ (All Party Parliamentary Group-APPG), তিনি আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস এর অন্যতম সদস্য, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি, খ্রিস্টান ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্ট এর ভাইস চেয়ারম্যান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া মানবাধিকার কমিশন (Southeast Asian Human Rights Commission ) এর সদস্য ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিরও সদস্য। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ খ্রিস্টান অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও গোবরাকুড়া স্থলবন্দর আমদানী-রপ্তানীকারক সমিতি’র প্রতিষ্ঠাতা এবং সভাপতি হিসেবে বর্তমানেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রমোদ মানকিন হালুয়াঘাট পাবলিক লাইব্রেরী’র আজীবন সদস্য ও হালুয়াঘাট প্রেস ক্লাবের প্রধান উপদেষ্টা। তিনি ভাষা শহীদ আব্দুল জব্বার স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় ও হালুয়াঘাট কারিগরী ও বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
একজন সংগঠক হিসাবে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে তিনি ভারতের মেঘালয় শিববাড়ি উদ্বাস্তু শিবিরে পরম আন্তরিকতার সাথে ৫০,০০০ শরণার্থীর দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’র সফরসঙ্গী হিসেবে জনাব মানকিন দু’বার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। এছাড়াও তিনি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, কানাডা, গ্রীস, নাইজেরিয়া, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, দুবাই, রাশিয়া, চীন, ভুটান ও ভ্যাটিকান সিটিসহ অনেক দেশ সফর করেছেন।

তিনি ১৯৬৪ সালের ২৯ জানুয়ারি নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার বিশিষ্ট গারো নেতা ও সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জোয়াকিম আশাক্রা এর জ্যৈষ্ঠ কন্যা মমতা আরেং এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি পাঁচ কন্যা ও এক পুত্রের জনক।

এডভোকেট প্রমোদ মানকিন ১৯৯১, ২০০১, ২০০৮, এবং ২০১৩ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদ এর সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি ২০০৮ সালে ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে প্রথমে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান, ২০০৯ সালের ১৫ জুলাই থেকে ২০১২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। তারপর ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১২ সাল থেকে বর্তমান সরকারের মেয়াদেও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

কোন মন্তব্য নেই

Leave a Reply